প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:৫৭ পিএম
হবিগঞ্জে দুই শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবার পায় ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী
আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাঠক সংগঠন অদম্য বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় এক হাজার চারশ পরিবারের মাঝে ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
রংপুর
রংপুরে সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীবসহ অন্য অতিথিরা ‘ওজাত (রোজায়) সবার কষ্ট। খাওয়ার জিনিসের দাম বাড়ছে, মাইনসের টাকাও কমি গেইছে। এমন দিনোত কাইয়ো সহযোগিতা করে না। ম্যালা কষ্টে ওজার দিন কাটাইতেছিনু। চাউল আর কার্টনের জিনিস পাওয়া ওজাত ঈদের খুশি আনি দেইল।’ কান্নায় ভেজা চোখে ৮০ বছর বয়সের পারুল বেগমের এমন অনুভূতি।
পেয়ারা বেগমের স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১০ বছর হলো। সন্তানরা তার দায়িত্ব না নেওয়ায় চায়ের দোকান করে চলে তার জীবন। খাদ্যসহায়তা ১৫ কেজি চাল, দুই কেজি আটা, দুই লিটার সয়াবিন তেল, এক কেজি মসুরের ডাল, এক কেজি ছোলা, এক কেজি চিনি, এক কেজি লবণ, গুঁড়োদুধের প্যাকেট, এক প্যাকেট খেজুর, হলুদ-মরিচের প্যাকেট ও এক প্যাকেট শরবতের পাউডার পেয়ে মুখে হাসি ফুটেছে তার।
২৮ মার্চ মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর শেখ রাসেল ইনডোর স্টেডিয়ামে ৪০০ অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ব্যুরোপ্রধান মেরিনা লাভলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুর জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব। আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারহান লাবীব জিসান, সাংবাদিক জয়নাল আবেদিন, হাসেম আলী, স্টাফ রিপোর্টার এহসানুল হক সুমন, অদম্য নভেল চৌধুরী, আরমান, আরাফাত, আনিকসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আহ্বায়ক আজহারুল ইসলাম দুলাল।
আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব বলেন, যেকোনো দুর্যোগসহ বিভিন্ন মানবিক কাজে অসচ্ছল মানুষের পাশে থেকে খাবার, শীতবস্ত্র, সেলাই মেশিন বিতরণসহ নানা ধরনের কর্মসূচি করে থাকি আমরা।বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে আল-খায়ের ফাউন্ডেশন। তারই ধারাবাহিকতায় ঈদের আগে অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্য উপহার বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন বলেন, সরকার টিসিবির মাধ্যমে অসহায় পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে। আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশের মতো সংগঠনের উদ্যোগ রমজানে অসচ্ছল মানুষের কষ্ট কমিয়ে এনেছে।
হবিগঞ্জ

‘রমজানে এ ধরনের খাবার ও ইফতারসামগ্রী আমার মতো গরিবের জন্য বিশাল পাওনা। ঈদের দিনটিতে খাবারের কোনো চিন্তা আর নেই। যারা কাজ করেন তাদের সবার জন্য আমি দোয়া করব।’ আনন্দ অশ্রু মুছে এমন কথা বলেন ৭০ বছর বয়সি ফটিক মিয়া।
আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে ইফতারসামগ্রী ও খাদ্যসহায়তা পেয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় তেঘড়িয়া গ্রামের আব্দুল খালেক, পইল গ্রামের মো. ইয়ান উদ্দিন, হরিপুর এলাকার রাহেনা আক্তার, গোপায়া ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের ফটিক মিয়াসহ অসংখ্য মানুষকে।
২৮ মার্চ মঙ্গলবার হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণে দুই শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিন্টু চৌধুরী, মেয়র আতাউর রহমান সেলিম, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার, অদম্য বাংলাদেশ-এর বিভাগীয় সম্পাদক দেবাশীষ বিশ্বাস, শিল্পপতি জাকারিয়া আহমেদ, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ দাস সাগর, শাকিল চৌধুরী, আশরাফুল ইসলাম কহিনুর, জাকারিয়া চৌধুরী ও নিরঞ্জন গোস্বামী শুভ প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, মানবতার সেবায় ও সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
গাইবান্ধা

‘আল্লাহ হামাক দয়া করচে। হামরা জীবনেও এমন সাহায্য পাই নাই। দুই প্রতিবন্ধীসহ চারজনের সংসার হামার। স্বামী-স্ত্রী রাস্তার পাশে আটার রুটি বিক্রি করি। দোকানত যেদিন আটার রুটি ব্যাচা হয়, সেদিন তিনবেলা খাবার জোটে। লাভ যা হয় তাতে সংসারে তিনবেলা ভালো খাবার তো জোটে না। প্রতিবন্ধী বাচ্চাগুলাকো এ্যানা বুন্দা খিলাবার পাই না। কিন্তু এত বড় বাক্স দেখে মনটা ভরি দেঘে। এখন অ্যাগলা দিয়া রোজার মাসটা ভালোভাবেই চলি যাবে।’ রমজান মাসে খাদ্যসহায়তা পেয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মুন্সিপাড়ার প্রতিবন্ধীর দুই সন্তানের মা রশিদা বেগম।
‘তেল, নুন, চাল-ডাল, চিনি সগে পালাম। আল্লাহ তোমাগ ভালো করবে বাবা। হামার আর রমজান থাকি ঈদের দিনের খাওয়ার চিন্তা নাই।’ এভাবেই আবেগে কণ্ঠে অভিব্যক্তি জানান গাইবান্ধার সদর উপজেলার ফলিয়া গ্রামের জাহেদা বেগম।
২৯ মার্চ বুধবার শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়ামে কামারজানি, খোলাহাটি, গিদারী, রামচন্দ্রপুর, বোয়ালীসহ বিভিন্ন এলাকার সুবিধাবঞ্চিত দুই শতাধিক পরিবারের মধ্যে ইফতার ও খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হয়। খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল লবণ, চিনি, গুঁড়োদুধ, খেজুর, ট্যাং, মসুর ডাল, ছোলাবুট, দুই লিটার তেল, মরিচ ও হলুদের গুঁড়ো পাকেট, ১৫ কেজি চাল, আটাসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য।
ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সুবিধাবঞ্চিতদের হাতে উপহার তুলে দেন গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজিব, প্রতিদিনের বাংলাদেশের গাইবান্ধা প্রতিবেদক মোস্তফা আবু বক্কর সিদ্দিক আলম, আফরোজা লুনা, অঞ্চলী রানী দেবী, আতিকুর রহমান আতিকসহ অরো অনেকে।
বিয়ানীবাজার

‘আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে ৩০ মার্চ বৃহস্পতিবার খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন প্রাঙ্গণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের দুই শতাধিক পরিবারের মধ্যে ইফতারসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফসানা তাসলিম, অদম্য বাংলাদেশ-এর বিভাগীয় সম্পাদক দেবাশীষ বিশ্বাস, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের সিলেট প্রতিনিধি কমল জিৎ শাওন। বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি আব্দুল ওয়াদুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস, পেপার এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আব্দুল বাসিত টিপু প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফসানা তাসলিম বলেন, আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে এ মহতী আয়োজন দেখে আমি মুগ্ধ। দুই শতাধিক পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তাদের ধন্যবাদ।
রমজান মাসে খাদ্যসামগ্রী পেয়ে অনেকের মতো আনন্দ প্রকাশ করেন দাসউরা গ্রামের বিধবা কুকিলা বেগম। তিনি বলেন, ‘ফুরুতাইনতর বাফ মরার বাদে তারারও ভালা কুনতা খাওয়াইতাম পারি না। তাইনতাইন বহুততা দিছইন কয়টা দিন ভালা করি খাওয়াইতাম পারমু ফুরুতাইইনতরে। আল্লায় তানতানরে আরো দৌলত বান করউক্কা।’
জগন্নাথপুর

আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে ইফতারসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ৩০ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পৌর শহরের আব্দুস সামাদ আজাদ অডিটরিয়ামে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হাতে এ খাদ্যসহায়তা তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজেদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক আহমদ, রেজাউল করিম রিজু, সমাজসেবক আকমল খান, পৌরসভার প্যানেল মেয়র সাফরোজ ইসলাম মুন্না, জুহের চৌধুরী প্রমুখ।
খাদ্যসহায়তা পেয়ে পৌরসভার বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, ‘ই রুজাত বাক্ষা জিনিস ফাইছি। শান্তিতে খাইতে পারমু। রোজা রাখুম ভালো সেহেরি খেয়ে। আল্লাহ আপনাগো ভালা করব।’ পাইলগাঁও গ্রামের ৫০ বছরের সানাউল্লা বলেন, ‘রুজায় মালছামনা ফাইয় আমি খুব খুশি অইছি। আমার পরিবার লইয়া খাইমু।’
তাহিরপুর

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দুই শতাধিক হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ৩১ মার্চ শুক্রবার সকাল ১১টায় উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের নোয়ানগর গ্রামে এ খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হয়। মারালা, রামজীবনপুর, রাজধরপুর, ভাটি তাহিরপুর ও জামালগড় গ্রামের অসহায় পরিবারের মাঝে বিতরণ খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল ২০ কেজি চাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি আটা, খেজুর, এক কেজি ডাল, ট্যাং, লবণ, ছোলাবুট, চিনি, গুঁড়োদুধ ও তিন প্যাকেট গুঁড়া মসলা।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হাতে খাদ্যপণ্য তুলে দেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুপ্রভাত চাকমা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন অদম্য বাংলাদেশ-এর বিভাগীয় সম্পাদক দেবাশীষ বিশ্বাস, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি কমলজিৎ শাওন, উপজেলা প্রেস ক্লাব সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সাংবাদিক শওকত হাসান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুপ্রভাত চাকমা বলেন, রমজান ও পবিত্র ঈদ উপলক্ষে আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও অদম্য বাংলাদেশ যে খাদ্যসহায়তা বিতরণ করেছে তা খুবই প্রশংসার দাবিদার। প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
খাদ্যসহায়তা পেয়ে ভাটি তাহিরপুর গ্রামের ৭৫ বছরের বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া বলেন, যে পরিমাণ খাদ্যসহায়তা পেয়েছি তাতে এই ঈদে আর বাজার করতে হবে না। উপহার পাওয়া খাদ্যসামগ্রী দিয়ে এবারের ঈদ উৎসব পালন করব।